|
গ্রেফতার-বিচার তত্ত্বাবধান করতে হবে প্রধানমন্ত্রীকেই
আল-আজাদ
প্রকৃতির লীলাভূমি বাংলাদেশে প্রায়ই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। আর তা ঘটছে এই ভূখণ্ড সৃষ্টির পর থেকেই। এতে প্রাণহানি হয়। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মারা গিয়েছিল ১০ লাখ নর-নারী-শিশু। এই কারণে ১৯৯১ সালে প্রাণ হারায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ। এছাড়া প্রতিবছরই বন্যা, বজ্রপাত, কালবৈশাখী ইত্যাদিতে অনেককে প্রাণ হারাতে হয়।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়। অল্প কিছু মানুষ সম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বার্থে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে রাখে। এতে প্রাণ যায় শত শত মানুষের; কিন্তু যারা এই হত্যাযজ্ঞের জন্যে সরাসরি দায়ী তাদের গায়ে বিপর্যয়ের আঁচটিও লাগে না। অনায়াসেই তারা সব দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যায়।
সর্বশেষ উদাহরণ সাভারের চলমান মানবিক বিপর্র্যয়। নয়তলা ভবন ধসে সেখানে কতজন যে প্রাণ হারিয়েছে তা দুইদিনেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর সঠিক সংখ্যা জানতে অবশ্যই কিছুটা সময় লাগবে; কিন্তু কে এ জন্যে দায়ী তা সাথে সাথেই সবার জানা হয়ে গেছে।
মমালাও হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই দায়ী ব্যক্তি সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা বিধ্বস্ত ভবনের নীচে চাপা পড়েছিলেন। আটকে পড়া অনেককে উদ্ধারের আগে তাকে উদ্ধার করা হয়। আর উদ্ধার করেন স্বয়ং ওই এলাকার সংসদ সদস্য তৌহিদ জং মুরাদ। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেই এ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কারণ জনগণের ভালমন্দ দেখা তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই এলাকার জনগণ বলতে কি এত প্রাণ কেড়ে নেয়ার দায় যার সেই লোকটি একা। অন্যদের দেখভালের দায়িত্ব কি সংসদ সদস্যের নয়। যদি থাকে তাহলে তিনি সবার আগে সোহেল রানাকে উদ্ধারে এত ব্যস্ত হলেন কেন।
শুধু উদ্ধারেই ব্যস্ত হলেন না-তাকে লাপাত্তাও করে দিলেন, যে কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের জন্যে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তৌহিদ জং মুরাদের পরের গুরু দায়িতট্বি ছিল সোহেল রানাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া; কিন্তু তিনি দেননি। কেন দেননি তা বুঝতে নিশ্চয়ই কারো অসুবিধা হচ্ছে না।
অন্যদিকে করিৎকর্মা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন, হরতাল সমর্থকরা নাকি ভবনটির ফাটল ধরা পিলাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে ভবনটি ধসিয়ে দিয়েছে। সুতরাং বিবিসিকে দেয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাক্ষাতকার ও এলাকার সাংসদের উদ্ধার অভিযানই বলে দেয়, প্রধানমন্ত্রী যতই আন্তরিক হোন না কেন আর তদন্ত প্রতিবেদন যে সত্যই বেরিয়ে আসুক না কেন ঠিক অতীতের অন্যসব মানবসৃষ্ট বিপর্য়য়ের মতোই সাভার বিপর্যয় এক সময় বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। এমন জঘন্য অপরাধ করার পরও কারো কোন সাজা হবে না। আর এই উদাহরণ ভবিষ্যতে এরকম আরো বিপর্যয়ের জন্যে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
শেষ কথাটি আসলে তিক্ত অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আর চায় বলেই দিনবদলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। যদিও সাড়ে ৪ বছরে প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ হয়নি। তবু আশা ছাড়েনি মানুষ। তাই আশা করে, অন্ততঃ মানুষ নামের ওই দানবগুলো-যারা নিজের স্বার্থে বারবার অগণিত প্রাণ কেড়ে নেয়, স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান করে দেয় অসংখ্য পরিবারের, হত্যার দায়ে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে দিনবদলের আরোকটি উৎকৃষ্ট উদারহণ তৈরি করা হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি শুধু সরকার প্রধান নন-বঙ্গবন্ধুর কন্যাও। এ দেশের মানুষের আবেগ-অনুভূতি-আকাক্সক্ষার কথা আপনার চেয়ে আর কে বেশি জানে বা বুঝে। স্বজন হারানোর যন্ত্রণা আপনাকে কুড়ে কুড়ে খায়। এই যন্ত্রণার খানিকটা উপশম হলো এতগুলো প্রাণ কেড়ে নেয়ার জন্যে যে বা যারা দায়ী তাদরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। সেই শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে আপনাকেই। কারণ ষোলকোটি মানুষের স্থির বিশ্বাস, প্রতিটি দুর্যোগে আপনার তত্ত্বাবধান থাকে বলেই দুর্যোগ কালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী করণীয়গুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়।
তাই দেশবাসী মনে করে, মানবসৃষ্ট দুর্যোগের জন্যে দায়ীদের গ্রেফতার এবং বিচারও আপনাকে তত্ত্বাবধান করতে হবে। কারণ আপনার অনেক মন্ত্রীর কথাবার্তায় তাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের ভিত অনকেটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। |